স্ক্যাবিস বা খোসপাঁচড়া কী?
স্ক্যাবিস (Scabies) হলো ত্বকের একটি ছোঁয়াচে রোগ, যা সারকোপটিস স্ক্যাবিয়াই (Sarcoptes scabiei) নামক এক ধরণের ক্ষুদ্র পরজীবী মাইট (Mite) দ্বারা সৃষ্ট হয়। এই অতিক্ষুদ্র পোকাগুলো খালি চোখে দেখা যায় না।
সংক্রমণের কারণ: এই মাইটগুলো মানুষের ত্বকের উপরের স্তরের নিচে গর্ত করে বাস করে এবং সেখানে ডিম পাড়ে। মাইট ও তাদের বর্জ্যের প্রতি অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার ফলে ত্বকে চুলকানি ও ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
ছড়িয়ে পড়া: এটি সাধারণত ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে বা আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত কাপড়, বিছানার চাদর, গামছা ইত্যাদির মাধ্যমে দ্রুত পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রধান লক্ষণ:
প্রচণ্ড চুলকানি: এটি স্ক্যাবিসের প্রধান লক্ষণ। রাতে বিছানায় উষ্ণতার কারণে চুলকানির তীব্রতা আরও বাড়ে।
ত্বকে দানা বা ফুসকুড়ি: ছোট ছোট দানা, গুটি বা ফোসকার মতো র্যাশ দেখা যায়। এগুলো থেকে জলীয় বা পুঁজযুক্ত তরল বের হতে পারে।
আক্রান্তের স্থান: বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকে, কবজি, কনুই, বগল, নাভির চারপাশ, যৌনাঙ্গ এবং কোমরের ভাঁজে চুলকানি বেশি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা, মুখ এবং হাতের তালুতেও হতে পারে।
🩹 খোসপাঁচড়া থেকে মুক্তির উপায় ও চিকিৎসা
স্ক্যাবিস থেকে মুক্তি পেতে হলে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তার পরিবারের সকল সদস্যের (যারা একসাথে বসবাস করেন) একযোগে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি, এমনকি যদি তাদের লক্ষণ প্রকাশ না-ও পায়।
১. বাহ্যিক প্রয়োগের ঔষধ (Cream/Lotion)
স্ক্যাবিসের চিকিৎসায় প্রধানত বাহ্যিকভাবে প্রয়োগ করার জন্য ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হল:
পারমেথ্রিন (Permethrin) ৫% ক্রিম/লোশন: এটি সাধারণত সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত।
ব্যবহারের নিয়ম: গোসলের পর শরীর ভালোভাবে শুকিয়ে ঘাড় থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত সমস্ত শরীরে ভালোভাবে লাগাতে হয় (২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা ও মুখমণ্ডল বাদে)। সাধারণত ৮ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর সাবান ও গরম জল দিয়ে ভালো করে গোসল করতে বলা হয়।
পুনরাবৃত্তি: রোগের তীব্রতা অনুযায়ী, ৭ দিন পর ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী একই নিয়মে পুনরায় ব্যবহার করতে হতে পারে।
২. খাবার ঔষধ (Oral Medication)
ক্ষেত্রবিশেষে, বিশেষ করে যখন বাহ্যিক চিকিৎসা কার্যকর হয় না বা ক্রাস্টেড স্ক্যাবিস (Crusted Scabies) এর মতো গুরুতর ক্ষেত্রে, ডাক্তাররা মুখে খাবার ঔষধ দিতে পারেন:
আইভারমেকটিন (Ivermectin): এটি একটি অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ঔষধ, যা নির্দিষ্ট ডোজে খাওয়ার জন্য দেওয়া হয়। এটিও সাধারণত ৭-১৪ দিনের ব্যবধানে এক বা একাধিক ডোজ লাগে।
৩. অন্যান্য সহায়ক ঔষধ
চুলকানি ও প্রদাহ কমানোর জন্য ডাক্তাররা আরও কিছু ঔষধের পরামর্শ দিতে পারেন:
অ্যান্টিহিস্টামিন (Antihistamine): রাতের তীব্র চুলকানি কমানোর জন্য এই ঔষধগুলো দেওয়া হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotic): যদি অতিরিক্ত চুলকানির ফলে ত্বক ক্ষতবিক্ষত হয়ে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হয়, তবে তা নিরাময়ের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ক্রিম বা ঔষধ দেওয়া হতে পারে।
✨ মুক্তির জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
শুধু ঔষধ খেলেই হবে না, রোগমুক্তির জন্য নিম্নলিখিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ:
পোশাক ও বিছানাপত্র: আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সমস্ত কাপড়, বিছানার চাদর, বালিশের কভার, তোয়ালে গরম জল এবং সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। সম্ভব হলে সিদ্ধ করে বা ইস্ত্রি করে ব্যবহার করতে হবে।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা: নিয়মিত গোসল করা এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সংস্পর্শ এড়ানো: চিকিৎসা চলাকালীন এবং রোগ পুরোপুরি সেরে না যাওয়া পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শ এবং অন্যের ব্যবহৃত জিনিস ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
আবারও মনে রাখবেন, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা ও ঔষধের জন্য চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের (Dermatologist) পরামর্শ নিন।


0 মন্তব্যসমূহ